দৃঢ় মনোবলের প্রতীক - হযরত বেলাল (রাঃ)


আবু আবদুল্লাহ বিলাল তাঁর পুরো নাম। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি হলেন হজরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর অন্যতম প্রধান সাহাবী এবং ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মুয়াজ্জিন। তিনি হজরত বেলাল (রাঃ)। তাঁর পিতা ছিলেন রাবাহ এবং মাতা ছিলেন হামামাহ। তিনি হাবশী বংশোদ্ভূত ক্রীতদাস ছিলেন, তবে মক্কায় জন্মলাভ করেছিলেন। বনু জুমাহ ছিলেন তাঁর মনিব।

হাবশী দাস হিসাবে তাঁর বাহ্যিক রং কালো হলেও অন্তর ছিল দারুণ স্বচ্ছ। আরবের গৌরবর্ণের লোকেরা যখন আভিজাত্যের ও কৌলিণ্যের বিভ্রান্তিতে লিপ্ত হয়ে হকের দাওয়াত অস্বীকার করে চলেছিল, তখনই তাঁর অন্তর ঈমানের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। অল্প কিছু লোক দাওয়াতে হক কবুল করলেও যে সাত ব্যক্তি প্রকাশ্য ঘোষণার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে এ হাবশী গোলাম অন্যতম। তিনি ছিলেন ইসলামের প্রাথমিক যুগের অন্যতম শক্ত স্তম্ভ।

চিরকালই দুর্বলরা অত্যাচার উৎপীড়নের শিকার হয়ে থাকে। বেলালের সামাজিক অবস্থানের কারণে ইসলামের গ্রহণের অপরাধে তাঁর ওপর অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট নেমে আসে। গলায় উত্তপ্ত বালু, পাথরকুচি ও জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর তাঁকে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে, গলায় রশি বেঁধে ছাগলের মত শিশুরা মক্কার অলিতে-গলিতে টেনে নিয়ে বেড়িয়েছে। তবুও তিনি ইসলামের পথে অবিচল ছিলেন। আবু জাহেল তাঁকে উপুড় করে শুইয়ে দিয়ে পিঠের ওপর পাথরের বড় চাক্কি রেখে দিতেন। মধ্যাহ্ন সূর্যের প্রচণ্ড খরতাপে তিনি যখন অস্থির হয়ে পড়তেন, আবু জাহেল বলতেনঃ “বেলাল, এখনও মুহাম্মাদের আল্লাহ থেকে ফিরে এসো ” কিন্তু তখনও তাঁর পবিত্র মুখ থেকে ‘আহাদ’ ‘আহাদ’ ধ্বনি বের হতো।

শেষ পর্যন্ত একদিন হজরত আবুবকর (রাঃ) মোটা অংকের অর্থ বেলালের মনিবকে দিয়ে তাকে মুক্ত করে দেন।

হযরত বেলাল প্রথম ব্যক্তি, আযানের দায়িত্ব যার ওপর অর্পিত হয়। বেলালের হৃদয়গ্রাহী আযান ধ্বনি শুনে নারী পুরুষ, কিশোর-যুবক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে কেউ ঘরে স্থির থাকতে পারতেন না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মদীনায় অবস্থান বা সফরের সময়, উভয় অবস্থায় বিলাল ছিলেন তাঁর বিশেষ মুয়াজ্জিন।

এ নিষ্ঠাবান রাসূলপ্রেমিক হিজরী ২০ সনে প্রায় ষাট বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। দামেস্কের ‘বাবুস সাগীরের’ কাছেই তাঁকে দাফন করা হয়।

চারিত্রিক সৌন্দর্য হযরত বেলাল (রা) মর্যাদা ও সম্মানকে অত্যধিক বাড়িয়ে দিয়েছিল।

মক্কায় যে অত্যাচার ও উৎপীড়ন হযরত বিলাল সহ্য করেছিলেন, তাতেই সহ্যশক্তি, ধৈর্য ও দৃঢ়তার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। কেউ তাঁর কোনও গুণের কথা বললে তিনি বলতেনঃ “আমি তো শুধু একজন হাবশী, কাল পর্যন্তও যে দাস ছিল।” সততা, নিষ্কলুষতা ও বিশ্বস্ততা ছিল তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url